top of page

ম্যাজিক মাশরুম ও বিভ্রম জগতের হাতছানি

  • Writer: Shifath Bin Syed
    Shifath Bin Syed
  • Nov 3, 2018
  • 3 min read

ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুম ও তারা নানাবিধ ব্যবহার সম্পর্কে আমরা সবাই জানি। বাড়ির আনাচে-কানাচে পচা স্যাঁতসেঁতে জায়গায় এদের দেখা পাওয়া যায়। ‘Alice In Wonderland’ মুভিতে যেমন Armillaria এর মত বিশালবপু ব্যাঙের ছাতা দেখি, তেমনি Enokitake এর মত ক্ষুদ্রাকার মাশরুমের কথাও আমাদের অজানা নয়। মাশরুম মূলত একধরনের ছত্রাক, কিছু মাশরুম বেশ খাওয়ার যোগ্য এবং উপাদেয় কিন্তু প্রকৃতিতে অনেক বিষাক্ত মাশরুমও দুর্লভ নয়। মাশরুম বহুবছর ধরে জনপ্রিয় খাবার হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে কিন্ত অতি সম্প্রতি বিশেষ একপ্রকার মাশরুম নিয়ে বেশ হৈচৈ হচ্ছে, আর সেটা হলো Psilocybin Mushroom। এটাকে আবার ভালবেসে নাম দেওয়া হয়েছে “ম্যাজিক মাশরুম (Magic Mushroom)” বা “শ্রুমস” (উইকিপিডিয়া)। কি এই ম্যাজিক মাশরুম এবং তার ম্যাজিক গুলো সম্বন্ধে জানা যাক তাহলে!

চিত্রঃ Psilocybe semilanceata ও Psilocybe allenii ম্যাজিক মাশরুম (উইকিপিডিয়া)

ম্যাজিক মাশরুম নিয়ে মাতামাতি অধুনা হলেও, প্রাচীনকালেও এই মাশরুমের ব্যবহার জানা যায়। পাথর যুগে ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে উত্তর আফ্রিকায় Tassili n’Ajjer অঞ্চলে, পাথরে উপর খোদাই করা চিত্রে এই মাশরুমের ছবি দেখা যায়। গ্রন্থকার জর্জিও সুমিরিনি’র মতে, খুব সম্ভবত ম্যাজিক মাশরুমকে সেই যুগে মানুষ সাময়িক চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহার করতো। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মের অনুষ্ঠান ও শেষকৃত্যে ম্যাজিক মাশরুম ব্যবহার করা হতো। ধারণা করা হয় মৃত আত্মাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্যই এটা সেবন করা হতো।

ম্যাজিক মাশরুমের অন্য নাম সিলোসাইবিন মাশরুম। ম্যাজিক মাশরুমের থাকা রাসায়নিক পদার্থ সিলোসাইবিনের (Psilocybin) জন্যই এরূপ নামকরন। সিলোসাইবিনের রাসায়নিক নাম, [3-(2-Dimethylaminoethyl)-1H-indol-4-yl] dihydrogen phosphate এবং রাসায়নিক ফর্মুলা, C12H17N2O4P। এটি একধরণের প্রাকৃতিক সাইকোডেলিক (Psychedelic) বা মাইণ্ড অল্টারিং (Mind Altering) পদার্থ। এটি মনোযোগের ঘাটতি, অস্থিরতা, হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়ার সাথে দৃষ্টিভ্রম ও শ্রবণবিভ্রম (Hallucinations) সৃষ্টি করে। আমাদের মস্তিষ্ক সবথেকে কমপ্লেক্স এবং আমাদের সব চিন্তা চেতনার উৎস। আমাদের সকল আবেগ-চিন্তা-চেতনা সবই আসলে বায়োকেমিক্যাল সিগন্যাল। নিউরোট্রান্সমিটার (Neurotransmitter) নামক একপ্রকার পদার্থ এক নিউরন থেকে অন্য নিউরনে সিগন্যাল পরিবহণ করে। সেরোটোনিন তেমনই একটা নিউরোট্রান্সমিটার। রাসায়নিক গঠনের দিক থেকে সিলোসাইবিন অনেকটা সেরোটোনিনের মত হওয়ায় এটি নিউরনে থাকা সেরোটোনিন রিসেপ্টরের (Serotonin Receptor) সাথে যুক্ত হয়। ফলে সেরোটোনিন যুক্ত হতে পারেনা এবং সিগন্যাল ট্র্যান্সফার বাধাগ্রস্থ হয়। এভাবেই সিলোসিন (সিলোসাইবিন শরীরে যাওয়ার পর সিলোসিনে (Psilocin) পরিবর্তিত হয়) মস্তিষ্কে চেতনাশক্তি হ্রাস করে এলএসডি’র মত মানসিক অবস্থা সৃষ্টি করে। সিলোসাইবিন নিউরনের সাথে সেরোটোনিনকে পুনরায় যুক্ত হতে দেয়না ফলে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি হয় (ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন)। পরিমাণমত খেলে এটা ভিন্ন ধরনের বাস্তবতা তৈরি করে, যেমন বিভিন্ন ধরণের রঙ দেখা, দৃষ্টিভ্রম হওয়া, সময় স্থির মনে হওয়া বা বিভিন্ন পরাবাস্তব অনুভূতি।

সিলোসাইবিন ডোজ ডিপেন্ডেন্ট ম্যানারে (Dose-dependent Manner) কাজ করে অর্থাৎ এর প্রভাব কেমন হবে সেটা নির্ভর করে কতটুকু খাওয়া হলো। মোটামুটি ০.৫-২.০ গ্রামের মত খেলে আধা ঘণ্টা পর থেকে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় (উইকিপিডিয়া)। সিলোসাইবিনের এই চেতনাশক্তি হ্রাসকারী প্রভাব তিন থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবিউজ এর মতে, কম পরিমাণ ম্যাজিক মাশরুম খুব কম মাত্রায় মারিজুয়ানার মত প্রভাব সৃষ্টি করে। আরো সাধারণভাবে বলা যায় যে, ম্যাজিক মাশরুম মস্তিষ্কের সম্মুখভাগের বহিরাবরণ (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স) এর উপর প্রভাব বিস্তার করে। মস্তিষ্কের এই অংশটি অবাস্তব চিন্তা ও চিন্তার বিশ্লেষণকে নিয়ন্ত্রণ করে।

1
2

চিত্রঃ সিলোসাইবিন ও নিউরোট্রান্সমিটার সেরোটোনিনের রাসায়নিক গঠন (ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াশিংটন)

এতক্ষণে নিশ্চয়ই ভাবছেন, এতো পুরোদস্তুর মাদক বা ড্রাগস। এতো পাওয়ারফুল হালুসিনেটিং ড্রাগ দিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কি লাভ! হ্যা লাভ আছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ম্যাজিক মাশরুম সৃষ্ট ইউফোরিয়ার (Euphoria) অনুভূতি বিষন্নতা, হতাশা, আসক্তি ও ওসিডি দূর করতে বেশ আশাপ্রদ (সায়েন্সএলার্ট)। ব্যাপারটাকে ‘কাটা দিয়ে কাটা তোলা’ বা ‘বিষে বিষক্ষয়’ বলতে পারেন। অতিসম্প্রতি জনহপকিন্স ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেষণায় সিলোসাইবিনের প্রভাবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যথাক্রমে ৮০ ও ৬০-৮০ শতাংশেরই উদ্বিগ্নতা ও বিষণ্ণতা কমতে দেখা গেছে। আসলে সেরোটোনিনের মত হওয়ার কারণে সিলোসাইবিন সরাসরি মস্তিষ্কের নিউরনে কাজ করতে পারে এবং সেজন্য বিভিন্ন মানসিক রোগের চিকিৎসায় এটা বেশ গুরুত্বপূর্ন। গবেষণায় দেখা গেছে বিষণ্ণতায় ভোগা রোগীদের ওষুধের সাথে সামান্য পরিমাণ সিলোসাইবিন আরোগ্য লাভকে ত্বরান্বিত করে। সিলোসাইবিন বিষন্নতায় ভোগা রোগীদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন জায়গার নিউরনের মধ্যকার সংযোগ বেড়েছে, একইসাথে সমস্যাজনিত নিউরনের মধ্যকার সংযোগ বন্ধ করে দেয়। ধূমপান বা অন্যান্য নেশা থেকে মুক্তি পেতেও সিলোসাইবিন ভূমিকা রাখতে পারে। এটি মাথাব্যথা কমাতেও বেশ কার্যকারী ভূমিকা রাখে (সায়েন্সডিরেক্ট)।

নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে ম্যাজিক মাশরুমের কিছু থেরাপিউটিক উপকার হলেও, কিছু রিস্ক থেকেই যায়। যেমন ম্যাজিক মাশরুম গ্রহণের কারণে “ব্যাড ট্রিপ” এর মত অনুভূতি হতে পারে। ব্যাড ট্রিপ হলো বিভ্রম সৃষ্টিকারী ড্রাগ গ্রহণের ফলে হওয়া বাজে অনুভূতিকে ব্যাড ট্রিপ বলা হয়। বিভ্রমজনিত বিষণ্ণতা (Dysphoric Hallucinations), বেপোরোয়া আচরন (Reckless behaviors) বা অনিয়ন্ত্রিত মস্তিষ্কবিকৃতি (Uncontrollable paranoia) হতেও পারে। এক স্টাডিতে দেখা গেছে, সুস্থ মানুষে সিলোসাইবিন গুচ্ছ মাথাব্যাথা (Cluster Headache) সৃষ্টি করতে পারে যা বেশকিছুদিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে (দ্যাথার্ডওয়েভ)। এছাড়া অধিকাংশ দেশেই সিলোসাইবিন নিষিদ্ধ এবং সিলোসাইবিনকে যুক্তরাজ্যে হেরোইন ও কোকেইনের মত প্রথম শ্রেনীর ড্রাগ হিসাবে গণ্য করা হয় (সায়েন্টিফিক অ্যামেরিকান)। তবে ব্রাজিল, জ্যামাইকা, নেদারল্যান্ডসহ বেশ কিছু দেশে এটা বৈধ।

শেষ করছি একটা মজার ক্রোয়েশিয়ান প্রবাদ দিয়ে, “সব মাশরুমই খাওয়ার যোগ্য, কিছু মাশরুম শুধু একবারের জন্য”। সিলোসাইবিনের বেশকিছু প্রজাতি বেশ বিষাক্ত, এছাড়া অন্য মাশরুম থেকে সিলোসাইবিন মাশরুম আলাদা করা বেশ কঠিন। তাই না জেনেশুনে মাশরুম খেয়ে ফেলা উচিৎ নয়। আর আমরা নিশ্চয়ই মাশরুম একবারের জন্য খেতে চাইনা, নাকি! সেজন্য আমাদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ম্যাজিক মাশরুম গ্রহণ করা উচিৎ। পাশাপাশি সিলোসাইবিন নিয়ে বিস্তর গবেষণার প্রয়োজন। চিকিৎসা বিজ্ঞানে সিলোসাইবিনের কার্যকারী প্রভাব পেতে হলে, এটাকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে (Target Specific) প্রয়োগ করার উপায় বের করতে হবে। ম্যাজিক মাশরুমের এই বিভ্রম জগত হাতছানিতে যদি ভালো কিছু হয়, তবে নাহয় একটু বিভ্রান্তই হলাম।

Comments


bottom of page